দেবী বাংলা সিনেমা রিভিউ

Share with social media...
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দেবী বাংলা সিনেমা রিভিউ – রিভিউ লেখার মতো সিনেমা এমনিতেই দেশে খুব একটা হয় না। কারণ সিনেমাকেও রিভিউয়ের যোগ্য হতে হয়। গত বছরের অক্টোবরে মুক্তি পেয়েছিল তুমুল ব্যবসা সফল ছবি ‘ঢাকা অ্যাটাক’। সিনেমা হলে গিয়ে সেই ছবি দেখে রিভিউ লিখেছিলাম। এরপর আরও ভালো ছবি হয়েছে। কিন্তু হলে গিয়ে দেখা হয়নি। ঠিক এক বছর পর জয়া আহসানের ‘দেবী’ আবারও টেনে নিয়ে গেল সিনেমা হলে। জয়া-চঞ্চলের ওপর পরিপূর্ণ আস্থা রেখেই প্রবেশ করলাম শ্যামলী সিনেমা হলে। এরপর দুটি ঘণ্টা দর্শককে মুগ্ধ করে রাখল ‘দেবী’।

ছবি মুক্তির ৯ দিন হয়ে গেলেও হলের টিকিট কাউন্টারের সামনে দুপুর ১২টা থেকে রাত পর্যন্ত সব শো হাউসফুল নোটিশ দেওয়া। মর্নিং শোতে ভিড় ঠেলে ভাগ্যক্রমে টিকিট পেয়ে প্রবেশ করলাম। এই ভিড় মনের আনন্দ আরও বাড়িয়ে দিল। যাক, সিনেমা শিল্প তবে একেবারে ধ্বংস হয়ে যায়নি।

সিনেমার রিভিউ বলতে বোঝায় একটি পরিপূর্ণ বর্ননামূলক লেখা। আমি আবার এই থিওরিতে বিশ্বাসী নই। নিজের মতো করেই পার্ট বাই পার্ট লিখে যাব। পাঠকরা এতে সহজেই ধরতে পারবেন প্রতিটি বিষয়।

গল্প : প্রবাদপ্রতীম কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত উপন্যাস ‘দেবী’ অবলম্বনে এই সিনেমা। গল্প নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। আমাদের কিশোর বয়সের থ্রিলারের নাম ‘দেবী’ আর ‘নিশীথিনী’। এই দুর্দান্ত উপন্যাসটি পর্দায় কীভাবে এল, সেটাই আসল বিষয়।

চিত্রনাট্য : সাহিত্য থেকে সিনেমা বানানোর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, মানুষ যেভাবে সাহিত্যের চরিত্রগুলোকে কল্পনা করে, পর্দায় সেভাবে ফুটিয়ে তোলা। এ ধরণের ছবি দেখতে গিয়ে দর্শকদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হতাশ হতে হয়। কল্পনার সঙ্গে বাস্তব মেলে না। কিন্তু ‘দেবী’র চিত্রনাট্যকার এই ক্ষেত্রে দারুণভাবে সফল হয়েছেন। হুমায়ূন আহমেদের ‘দেবী’ আমাদের মনে যে কল্পিত চরিত্রগুলো এঁকেছিল, অনম বিশ্বাসের ‘দেবী’ তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। পুরো সময়টা টানটান উত্তেজনা বজায় ছিল।

অভিনয় : অভিনয়ের দিক বলতে গেলে, ছোট-বড় সব চরিত্রেই দারুণ অভিনয় করেছেন শিল্পীরা। তবে লিডিং কিছু চরিত্রের অভিনয়ের ব্যবচ্ছেদ করা যাক।

জয়া আহসান : এই গুণী অভিনেত্রীর কাছ থেকে দর্শকরা যা আশা করে তার চেয়েও অনেক বেশি উজার করে দিয়েছেন। অন স্ক্রিন তিনি ছিলেন ‘ওয়ান ম্যান শো’। আর কিছু বলার কি দরকার আছে?

চঞ্চল চৌধুরী : এই মুভির সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে অভিনয় করেছেন চঞ্চল। ‘মনপুরা’, ‘মনের মানুষ’ কিংবা ‘আয়নাবাজি’ খ্যাত এই অভিনেতা মিসির আলী চরিত্রেও দুর্দান্তভাবে সফল! প্রিয় চরিত্রে চঞ্চলের অসাধারণ অভিনয় দেখতে পারলে হুমায়ূন আহমেদ নিশ্চয়ই তার পিঠ চাপড়ে বাহবা দিতেন। যারা সিনেমাটি দেখেছেন, আমি নিশ্চিত তাদের কল্পনার মিসির আলীর সঙ্গে মিলে গেছে পর্দার মিসির আলী।

শবনম ফারিয়া : দুজন হেভিওয়েট শিল্পীর সঙ্গে অভিনয় করা শবনম ফারিয়াকে নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা ছিল। কিন্তু হলে ঢুকে সেই ভুল ভাঙল। আশ্চর্যজনকভাবে জয়া-চঞ্চলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অভিনয় করে গেছেন ফারিয়া। তার লুকটাও ছিল অসাধারণ। পাশের বাড়ির মেয়েটার মতো।

অনিমেষ আইচ : ‘আনিস’ চরিত্রে অভিনয় করা পরিচালক অনিমেষ আইচকে আমি খুব বেশি নম্বর দিতে পারছি না। ইমোশন, এক্সপ্রেশন আর ডায়লগ থ্রোয়িংয়ে কিছুটা পিছিয়ে তিনি। তবে এতে সিনেমার খুব একটা ক্ষতি হয়নি। অনিমেষ আইচ খারাপ করেননি; তবে তিনি আরও ভালো করতে পারতেন।

ইরেশ যাকের : অভিনয়ের খুব বেশি জায়গা ছিল না। বেশিরভাগ সময় পরিচালক তাকে চিঠি আর মেসেঞ্জারেই সীমাবদ্ধ রাখলেন। যতটুকু সময় পর্দায় ছিলেন, ভালো করেছেন। নিজের চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি।

ডিরেকশন : পরিচালক অনম বিশ্বাসের এটা প্রথম ছবি। আমি বলব, তার সেন্স অব হিউমার যে প্রবল, তার প্রমাণ এই ছবিটি। শুরু থেকেই মানুষকে থ্রিল উপহার দিয়েছেন, সঙ্গে সিরিয়াস কমোডি। জীর্ণ মন্দিরের সিঁড়িতে বসে গাঁজাসেবনের দৃশ্য কিংবা শুরুতে মিসির আলীর কমোডের দৃশ্য খুবই বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে চিত্রায়ন করা হয়েছে।

পত্রিকার বিজ্ঞাপনের জায়গায় ২০১৮ সালের প্রেক্ষিতে সাবেত-নীলুর যোগাযোগ মেসেঞ্জারের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে; যা বেশ ইন্টারেস্টিং।

স্ক্রিনে চরিত্রগুলোর এন্ট্রিতে খুব বেশি নাটকীয়তা দেখাননি তিনি। এটা নতুনত্ব। শেষ দৃশ্যে নীলুকে আহমেদ সাবেত ধরে নিয়ে যাওয়ার পর খুব তাড়াহুড়া মনে হয়েছে। আহমেদ সাবেত কে? কেন তিনি এসব করছেন- ‘ফ্যাক্ট’ এবং ‘ট্রুথ’কে আলাদা করে আরও বিস্তারিত বলা যেত।

গল্পের গতি : শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দর্শক ধরে রাখার মতো গতি ছিল সিনেমায়। পুরো সময়টা থ্রিলিং এক্সপেরিয়েন্স পেয়েছে দর্শকরা। মাঝে মধ্যে কিছু দৃশ্য এসে রিলিজ দিয়ে গেছে। এক মুহূর্তের জন্যও মনে হয়নি, গল্প ঝুলে যাচ্ছে। পুরো সময়ের থ্রিল শেষ সময়ে গিয়ে চরম আকার ধারণ করে। যা বেশ উপভোগ্য।

লাইট : সিনেমায় আলো যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হয়তো এক বছর আগেও বুঝত না দেশের পরিচালকেরা। এখন তরুণ পরিচালকরা আলোর ওপর বেশ জোর দিচ্ছেন বোঝা যায়। যে কারণে পরিমিত এবং প্রয়োজনীয় আলো ব্যবহারে ‘দেবী’ নজর কেড়েছে।

সাউন্ড : একটা আদর্শ থ্রিলারের জন্য যে ধরণের সাউন্ড প্রয়োজন; অনম বিশ্বাস তার কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। সত্যি বলতে, খুব ভালো লেগেছে ‘দেবী’র শব্দ ব্যবস্থাপনা। ব্যকগ্রাউন্ডে অশরীরী আহ্বান, সাসপেন্স মিউজিক খুবই সুন্দর।

ক্যামেরা : ঝকঝকে ছবি; চমৎকার সিনেমাটোগ্রাফি আর ফ্রেমিংয়ের জন্য ‘দেবী’র প্রশংসা করতেই হবে। সাসপেন্ট মোমেন্টগুলোতে ক্যামেরার মুভমেন্ট, জার্কিং নজর কেড়েছে।

এডিটিং : আরেকটু থ্রিলিং করা যেত। শেষ দৃশ্যে আহমেদ সাবেতের দিকে অস্ত্রগুলোর ছুটে আসা বেশ ভালো লেগেছে। মন্দিরে রানু যখন জালালউদ্দিনের হাত ভেঙে দিচ্ছিল, তা নজর কেড়েছে।

সঙ্গীত: কোনো বাড়াবাড়ি করা হয়নি গানের ক্ষেত্রে। সঠিক জায়গায় এবং গল্পের প্রয়োজনে সঙ্গীত ব্যবহার করা হয়েছে। আর অনুপম রায়ের সঙ্গীত পরিচালনা তো বলার অপেক্ষা রাখে না।

প্রপস এবং কস্টিউম : পুরনো মন্দিরে ঝকঝকে দেবী মুর্তি বেমানান লেগেছে। মিসির আলীর চুলটা একটু আর্টিফিসিয়াল লাগছিল। সব চরিত্রের কস্টিউম বেশ ভালো ছিল।

ওভারঅল : যদি একটি ভালো মুভি দেখার বাসনা থাকে, তবে ‘দেবী’ দেখতে পারেন। থ্রিলার প্রেমীদের জন্য এটা একটা দুর্দান্ত বাংলা ছবি। সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু সিনেমা ফেলে দেওয়ার মতো নয়। এটি শুধু হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের উপস্থাপন নয়; এটা নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধেও একটি সিনেমা। রানুর মতো শৈশবে এমন ভয়ংকর যৌন নিপীড়নের অভিজ্ঞতা হয় অনেক কিশোরীর। হুমায়ূন আহমেদ এই সামাজিক ক্যান্সারকে কলমে তুলে ধরেছেন; আর অনম বিশ্বাস তুলে ধরলেন সিনেমার পর্দায়। দুটি অসাধারণ।

Related Posts

  • 41
    একটি স্থিরচিত্রকে ঘিরে নতুন জুটি নিয়ে নির্মিত হচ্ছে নতুন ছবি ‘বাঁশতলার পাগলা’। আফজাল হোসেন পরিচালিত ছবিটিতে অভিনয় করছেন নতুন জুটি আসাদ আদনান ও মাশরুরা জামান দিনা। নায়ক-নায়িকা ও পরিচালকের এটিই প্রথম ছবি। ‘বাঁশতলার পাগলা’ প্রসঙ্গে আফজাল হোসেন রোববার (৮ এপ্রিল) বলেন, আমি ২৩ বছর ধরে ফটোগ্রাফি করছি। বেশকিছু ছবিতে ফটোগ্রাফার…
    Tags: ছবি, অভিনয়, একটি, আমি, নিয়ে, পরিচালক, গল্প, শেষ, মনে, তবে
  • 33
    ‘আমরা হয়তো ভাবি সিনেমা নাচ-গানে ভরপুর কিছু একটা। আরও মোটাদাগে বললে, দরিদ্র লোকের জন্য স্থূল বিনোদন। এটা মোটেও তা না। চলচ্চিত্র বাংলাদেশের প্রচার হতে পারে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।’ কথাগুলো অভিনয়শিল্পী ও নির্মাতা তৌকীর আহমেদের। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত নতুন ছবি ‘ফাগুন হাওয়ায়’-এর ফার্স্টলুক প্রকাশের অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তৌকীর। বেশ কিছুদিন…
    Tags: এই, একটি, নিয়ে, হয়েছে, না, ছবি, সিনেমা, জন্য, অভিনয়, হয়
  • 31
    সাম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত স্বপ্নজাল সিনেমায় ভিন্ন লুকে ইরেশ জাকের ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা পেয়েছেন ইরেশ যাকের। ‘ছুঁয়ে দিলে মন’ ছবিতে খল অভিনেতা হিসেবে অভিনয় করে ২০১৫ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ঘরে তুলেছেন তরুণ এই অভিনেতা। শুক্রবার (৬ এপ্রিল) সারাদেশে মুক্তি পেয়েছে ইরেশ অভিনীত ও গিয়াস উদ্দিন সেলিম পরিচালিত ‘স্বপ্নজাল’। ছবিটিতে…
    Tags: অভিনয়, করেছেন, একটি, তিনি, নিয়ে, তবে, করে, চরিত্রে, জন্য, পর্দায়
  • 30
    বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তী কথাসাহিত্যিক, বাংলা সিনেমা ও টেলিভিশন নাটকের নন্দিত নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের ৭০তম জন্মদিন মঙ্গলবার (১৩ নভেম্বর)। এ উপলক্ষে চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সপ্তমবারের মতো হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে ‘হুমায়ূন মেলা’। সকাল ১১টা ০৫ মিনিটে হিমুপ্রেমিরা হলুদ পাঞ্জাবী গায়ে দিয়ে মেলায় উপস্থিত হয়ে হলুদ বেলুন উড়িয়ে মেলার উদ্বোধন করেন।…
    Tags: হুমায়ূন, আহমেদের, পরিচালক, হয়, আহমেদ, মতো, বাংলা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *